জেগে উঠুন আপন আলোয়..........

ভালোবাসা : আল্লাহর জন্যে ?

যারা পরস্পরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার জন্যে ভালোবাসে তাদের মর্যাদা অনেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছেজান্নাতে তাদের উচ্চ সম্মানিত স্থানের কথা ওয়াদা করা হয়েছে এবং যেদিন সমগ্র মানব জাতিকে তাদের রবের সম্মুখে দাঁড় করানো হবে বিচারের জন্যে, সেদিন আল্লাহ তায়ালা যে সম্মান তাদেরকে দান করবেন তাও বর্ণিত হয়েছে 
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিততিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ৭ শ্রেণীর লোকদের মহান আল্লাহ সেদিন তাঁর সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যেদিন তাঁর ছাড়া অন্য কোন ছায়াই থাকবে নাতাঁরা হলেনঃ১ ন্যায়বিচারক শাসক বা নেতা২ মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল যুবক৩ মসজিদের সাথে সম্পর্কযুক্ত হৃদয়ের অধিকারী৪ যে দুজন লোক একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব করে এবং এ জন্যেই আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়৫ এরূপ ব্যক্তি যাকে কোন অভিজাত পরিবারের সুন্দরী নারী খারাপ কাজে আহবান করেছে, কিন্তু সে বলে দিল, আমি আল্লাহকে ভয় করি৬ যে ব্যক্তি এতো গোপনভাবে দান-খয়রাত করে যে, তার ডান হাত কি দান করলো, বাঁ হাতেও তা জানতেপারলো না৭ এরূপ ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর যিকির করে এবং দুচোখের পানি ফেলে (কাঁদে)।[বুখারী ও মুসলিম]
যে দুজন পরস্পরকে আল্লাহর জন্যে ভালোবাসে তাদের জন্যে স্পষ্টভাবে সুসংবাদ জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তারা আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের উপর তাঁর অসীম রহমত ও করুণা বর্ষিত করবেনকত বিরাট এই সম্মান ! এই সম্মানই তো যথেষ্ট যে, যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্যে ভালোবাসে তাদেরকে শেষ বিচারের দিন ডাকা হবে এবং বলা হবে ; “কোথায় তারা যারা একে অপরকে আমার সম্মানে ভালোবেসেছো ? আজ তাদেরকে আমি আমার ছায়াতলে আশ্রয় দান করব যখন আমার (আরশের) ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া নেই” (মুসলিম) এরকম সুমহান মর্যাদা ও সমুন্নত সম্মান তাদের যোগ্য প্রাপ্য যারা কিনা আল্লাহর জন্যেই পরস্পরকে ভালোবাসে
এই পৃথিবী যা কিনা লোভ, লালসা এবং স্বার্থপরতায় পরিপূর্ণ; সেখানে বসবাস করে কাউকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে ভালোবাসা, অন্য কোন কিছুর জন্যে নয় ; তা বেশ কঠিন নয় কি? পবিত্র ও বিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী ব্যতীত অন্য কেউ এই ভালোবাসা অর্জন করতে পারে না, যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্যে ভালোবাসে তাদের নিকট এই দুনিয়ার জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম ব্যতীত আর কিছুই নয়তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, আল্লাহ তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দান করবেন অন্যদের উপরে যারা দুনিয়ার ভালোবাসায় ডুবে রয়েছেআমরা এর প্রমাণ পাই হযরত মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত এই হাদীসটিতে যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; “আল্লাহ (সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা ) বলেন; ‘যারা আমার সম্মানে পরস্পরকে ভালোবাসে, তারা নূরের মিম্বার লাভ করবে, এবং নবীগণ ও শহীদগণও অনুরূপ ইচ্ছা করবেন” [তিরমিযি কর্তৃক হাসান সহীহ হাদীস]
যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্যে ভালোবাসে তাদেরকে সুমহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর রহমত ও করুণার পাশাপাশি আরো একটি দুর্লভ অনুগ্রহ দান করবেন, যা কিনা অর্জন করা খুবই কঠিনআর তা হল মহান প্রতিপালকের নিজের পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি ভালোবাসা ! হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “একটি লোক অপর একটি গ্রামে তার ভাইকে দেখতে গেলআল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দিলেনতিনি লোকটির জন্যে রাস্তায় অপেক্ষা করতে থাকলেনযখন লোকটি আসল, তখন ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় যেতে মনস্থির করেছ?’ লোকটি বলল, ‘আমি আমার এক ভাইকে দেখতে যাচ্ছি যে এই গ্রামে থাকেফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তুমি কি তার প্রতি কোন অনুগ্রহ করেছ(যার কারণে তুমি প্রতিদান আশা কর)?’ সে বলল, ‘নাআমি কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যেই তাকে ভালোবাসিফেরেশতা তাকে বললেন, ‘আমি আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার নিকট প্রেরিত একজন দূত, তিনি(আল্লাহ) তোমাকে ভালোবাসেন যেরকম তুমি তোমার ভাইকে তাঁর জন্যে ভালোবাসো, আমি তোমাকে এটা বলার জন্যই প্রেরিত হয়েছি” (মুসলিম) 
কত অসাধারণ এই ভালোবাসা ! যা একজন মানুষকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যায় যখন স্বয়ং আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন !
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা হতে জানা যায় যে, দুই ব্যক্তির মধ্যে সে উত্তম যে অপরকে আল্লাহর জন্যে বেশি ভালোবাসেরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “এমন কোন দুই ব্যক্তি নেই, যে কিনা তার ভাইয়ের প্রতি অধিক ভালোবাসা পোষণ করে অথচ সে অপরজন অপেক্ষা উত্তম নয় । [বুখারী, আদাব-আল-মুফরাদ] 
ইসলামের শিক্ষা ভালোবাসা ছড়াতে সাহায্য করে, একটি সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়তা করেকেউ যদি তার মুসলিম ভাইকে ভালোবাসে তার উচিত তাকে জানিয়ে দেয়ারাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; “যদি কোন ব্যক্তি তার ভাইকে ভালোবাসে, তাকে বলতে দাও যে সে তাকে ভালোবাসে। [আবু দাউদ ও তিরমিযি একে সহীহ বলেছেন]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই পবিত্র, নির্মল ভালোবাসার গুরুত্ব বুঝেছিলেনসমাজ ও জাতি গঠনে এবং পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে তা সহায়কতাই তিনি এমন কোন পরিস্থিতি এড়িয়ে যাননি যখন একজন মুসলিম অপর আরেকজন মুসলিমের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেহৃদয়ের পংকিলতা দূর করতে এবং মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করতে এই পবিত্রতা ছড়িয়ে দেয়া উচিত সকল হৃদয়ে
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে একজন লোক অবস্থান করছিলেন, এমতাবস্থায় অন্য এক ব্যক্তি সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলপ্রথম ব্যক্তি বললেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি এই লোকটিকে সত্যিই ভালোবাসিরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি তাকে তা জানিয়েছো?” লোকটি বলল, নারাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “তাকে বলপ্রথম লোকটি তাকে দৌড়ে ধরে ফেলল এবং বলল, “সত্যিই আমি তোমাকে আল্লাহর জন্যে ভালোবাসিলোকটি উত্তর করল, ” আল্লাহও তোমাকে ভালোবাসুন যে আমাকে তাঁর জন্যে ভালোবাসে। [আবু দাউদ, সহীহ]

হযরত মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু এই পবিত্র ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতেন মুসলিমদের মাঝে, এবং তিনি সেই বিরাট পুরষ্কার সম্পর্কে তাদেরকে বলতেন যা আল্লাহ তায়ালা প্রস্তুত করে রেখেছেন যারা আল্লাহর জন্যে পরস্পরকে ভালোবাসে, যারা আল্লাহর জন্যে পরস্পরকে ভালোবাসে তাদেরকে আল্লাহও ভালোবাসেন
 ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ তাঁর আল-মুয়াত্তায় একটি সহীহ ইসনাদ বর্ণনা করেছেন, আবু ইদরিস আল-খুলানি থেকেতিনি বলেন, “আমি দামেস্কের মসজিদে প্রবেশ করলাম, সেখানে আমি অল্প বয়স্ক একজন লোককে দেখলাম যার হাসি ছিল ঝলমলে উজ্জ্বল, এবং আমি লোকদের দেখলাম তাকে কেন্দ্র করে ভিড় করতেযখন কোন একটি বিষয়ে তাদের মতানৈক্য হল, তারা যুবক লোকটির কাছে সে বিষয়টি উপস্থাপন করল এবং তার মতামত মেনে নিলআমি জানতে চাইলাম, এই লোকটি কে ছিল , তারা আমাকে বলল, ‘ইনি মুয়ায ইবন যাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)পরদিন খুব সকাল সকাল আমি মসজিদে গিয়ে হাজির হলাম কিন্তু গিয়ে দেখলাম তিনি তারও আগে সেখানে উপস্থিততিনি নামাযরত ছিলেন, তাই আমি শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম, এরপর আমি তার কাছে গেলাম, হাসি বিনিময় করলাম এবং বললাম, “আল্লাহর জন্যে আমি আপনাকে ভালোবাসিতিনি জানতে চাইলেন, “আল্লাহর জন্যে?” আমি বললাম, “আল্লাহর জন্যেতিনি আবার প্রশ্ন করলেন, “আল্লাহর জন্যে”? এবং আমি বললাম, “আল্লাহর জন্যেএকারণে তিনি আমাকে আমার জামা ধরে টেনে তার কাছে নিলেন এবং বললেন, “তোমার জন্যে সুসংবাদ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, “আল্লাহ সর্বশক্তিমান বলেনঃ আমার ভালোবাসা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত যারা একে অপরকে ভালোবাসে আমার জন্যে, যারা একে অপরকে দেখতে যায় আমার জন্যে এবং যারা একে অন্যের প্রতি খরচ করে আমার জন্যে

Popular Posts

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.