জেগে উঠুন আপন আলোয়..........

ঈমান:- ইসলামের মূল ভিত

ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো দৃঢ় বিশ্বাসইসলামী পরিভাষায় হজরত মুহাম্মদ সাঃ আল্লাহর কাছ থেকে যে কিতাব বা মহাগ্রন্থ প্রাপ্ত হন তাতে এবং তিনি যে পথ প্রদর্শন করে গেছেন এতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করাই হলো ঈমানঅন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকারোক্তি এবং সৎকর্ম বা আমলে সালেহা­ এ তিনের সমন্বয় হচ্ছে ঈমানকথায়, বিশ্বাস এবং সৎকর্মের পরিপূর্ণ প্রতিফলন হলো ঈমান 
 পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারার প্রথম আয়াতঃ এই সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেইমুত্তাকিদের জন্য এটি পথপ্রদর্শকপ্রশ্ন জাগেঃ মুত্তাকি কারা? আসলে মুত্তাকি শব্দের মধ্যেই ঈমানের স্বরূপ বিশ্লেষিত হয়, যা ঠিক পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছেঃ তারাই মুত্তাকি যারা গায়েববা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে, সালাত কায়েম করে, আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করেতিনটি বিষয় এখানে অতি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়ঃ অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন, নামাজ প্রতিষ্ঠা এবং স্বীয় সম্পদ থেকে কিছু ব্যয় করাঈমানের যথার্থ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এখানে দুটি বিশেষ আরবি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, ‘ইউমেনুনাএবং বিল গায়েবঅর্থাৎ ঈমান এবং গায়েবঈমান মানে বিশ্বাস; গায়েব হচ্ছে অদৃশ্য অর্থাৎ অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপনপবিত্র কুরআনে গায়েব বা অদৃশ্য শব্দ দ্বারা যেসব বিষয়কে নির্দেশ করা হয়েছে যেগুলোর সংবাদ রাসূল সাঃ দিয়েছেনস্বীয় বুদ্ধি বলে ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এসব বিষয় অবহিত হওয়া যায় না (সূত্রঃ তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন, পৃঃ ১৩) অদৃশ্য বা গায়েবের মধ্যে ঈমানের সারবত্তা অন্তর্নিহিত­ এ অন্তর্ভুক্ত করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও সত্তা, আল্লাহর গুণাবলি, ভাগ্য বা তকদির, বেহেশত-দোজখ, কিয়ামত বা বিচার দিবসের ঘটনা, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব পূর্ববর্তী সব নবী-রাসূলের ওপর আস্থা স্থাপন ইত্যাদিউল্লিখিত সূরার ১৭৭ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছেঃ ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, কিয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নবী-রাসূলের ওপর আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে, আর যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দান করে তারাই সত্যাশ্রয়ী আর তারাই পরহেজগার
সালাত বা নামাজ হচ্ছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে শরিয়া নির্দেশিত প্রার্থনাসালাত হলো আল্লাহর ইবাদতের সাধারণ আরবি নামএর ফারসি প্রতিশব্দ হচ্ছে নামাজঅদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপনের সাথে ইকামা সালাতশব্দ অর্থাৎ নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা সংযুক্ত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নামাজের অপরিসীম গুরুত্ব প্রকাশ পায়ঈমানের প্রাথমিক সোপান হচ্ছে নামাজনামাজ আদায় এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে­ নামাজ আদায় করা অর্থ হচ্ছে স্বীয় কর্তব্য পালন করাঅন্য দিকে নামাজ কায়েম করার অর্থ নামাজকে স্থায়িত্ব দান করা, সুদৃঢ় করা এবং একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়াএখানে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছেশরিয়াসম্মত বিধিবিধান অনুসরণে যথাযথভাবে নামাজ আদায়কে অভ্যাসে পরিণত করে এবং এর ধারাবাহিকতা চির বিদ্যমান রাখাই হচ্ছে নামাজ কায়েম বা প্রতিষ্ঠানামাজ বলতে সব ধরনের সালাত এবং ইবাদতের সব অঙ্গকে অন্তর্ভুক্ত করেআসলে সালাত কায়েম বলতে মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কায়েমের কথা বলা হয়েছে
রিজিক থেকে ব্যয়ঃ আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক থেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কিছু অংশ প্রদান করা মুত্তাকিদের অন্য এক বৈশিষ্ট্যব্যয় বলতে জাকাত ও অন্যান্য দান-খয়রাত অর্থ করা হয়তবে জাকাতের জন্য পৃথক শব্দ জাকাতস্বীকার এবং উল্লিখিত আয়াতে ইনফাক আরবি শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় এটি সাধারণত দান-খয়রাতকেই নির্দেশ করেসব বিষয়-সম্পদের মালিকানা আল্লাহরতিনিই মানুষকে প্রাচুর্য দিয়েছেনসুতরাং মানুষের উচিত স্বীয় সম্পদ থেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে অর্থাৎ সৎকর্ম ও সৎপথে ব্যয় করা, বিশেষ করে অর্থহীন ও অভাবীদের সাহায্য সহযোগিতা করাস্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, এ দান কারোর প্রতি তার অনুগ্রহ নয়­ এ হচ্ছে স্বীয় হক আদায়প্রকৃতপক্ষে ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য যে ব্যয়, সেটাই আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় বোঝায়
ঈমান হলো সব কার্যের মূল ভিত্তি এবং এর ওপরই নির্ভর করে আমলের গ্রহণযোগ্যতাপ্রকৃতপক্ষে তারাই মুত্তাকি যাদের ঈমান পূর্ণাঙ্গ এবং আমলও পূর্ণতাপ্রাপ্ত পেয়েছেঈমান ও আমল এ দুয়ের সমন্বয়ই হচ্ছে ইসলামএ পর্যায়ে ঈমান ও ইসলামের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্ণয় করা আবশ্যককোনো বিষয়ে আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন হচ্ছে ঈমান, কারোর প্রতি অনুগত হওয়ার নাম ইসলামঈমান অন্তর থেকে সূচিত এবং বাহ্যিক ক্রিয়াকর্মে এর যথার্থ প্রতিফলনে পূর্ণতা লাভ করেঅন্য দিকে ইসলামের শুরু বাহ্যিক বা প্রকাশ্য ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে যা ক্রমে ক্রমে মর্মস্পর্শী হয়ে পূর্ণতা লাভ করেঅন্তরের বিশ্বাস ও আমল উভয় পরিপূর্ণতা লাভ করলেই তা গ্রহণযোগ্য হয়অপর দিকে প্রকাশ্য আনুগত্য আন্তরিক বিশ্বাসে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত তা গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে না 
সূরা বাকারার ৪ নম্বর আয়াতে মুত্তাকিদের আরো কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়আয়াতের বর্ণনা নিুরূপঃ এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের ওপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের ওপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছেআর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করেবর্ণনায় তিনটি বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হয়ঃ 
১. মুহাম্মদ সাঃ-এর ওপর অবতীর্ণ কিতাব অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের ওপর বিশ্বাস,
২. মুহাম্মদ সাঃ-এর পূর্ববর্তী রাসূলদের ওপর কিতাব অর্থাৎ তাওরাত, যবুর ও ইঞ্জিলের ওপর বিশ্বাস এবং সর্বোপরি  
৩. পরকাল বা আখেরাতের ওপর বিশ্বাসআখেরাতের ওপর বিশ্বাস মুত্তাকিদের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্যমৃতুøর পর পরকালে নিজ আমলনামাসহ আল্লাহর সামনে উপস্থিত, কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ, দান-প্রতিদান, পাপ-পুণ্য সব কিছুরই এক সামগ্রিক চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠবেফলে মানুষ অন্যায় করতে পারে না­ এখানে পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছে না­ করছে তার ধর্মীয় চেতনাবোধ ও আন্তরিক বিশ্বাসঅত্র সূরার সমাপ্তিতে আয়াত নম্বর ২৮৫-এ ঈমান সম্পর্কে পুনরায় উল্লেখ রয়েছেবলা হয়ঃ রাসূল বিশ্বাস রাখেন ওই সব বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর নিকট অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাওসবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থগুলোর প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরদের প্রতিতারা বলে, আমরা তাঁর পয়গম্বরের কোনো পার্থক্য করি নাতারা বলে, আমরা শুনেছি, আমরা কবুল করছিআমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তাতোমারই দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবেউদ্ধৃতির প্রথমেই রাসূল সাঃ-এর ওপর বিশ্বাসের কথা পরিব্যক্ত হয় এবং এরপর স্বতন্ত্রভাবে মুমিন মুসলমানদের বিশ্বাস প্রসঙ্গ এসেছেবর্ণনা-ভঙ্গি আভাস প্রদান করে যে, যদিও আমল ও বিশ্বাসে রাসূল সাঃ ও অন্যান্য সব মুসলমান এক ও অভিন্ন, তবুও বিশ্বাসের স্তরে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছেরাসূল সাঃ-এর বিশ্বাস প্রত্যক্ষ ও ওহিজাতঅন্য মুসলমানদের বিশ্বাস গায়েবে এবং রাসূল সাঃ-এর মাধ্যমে (সূত্রঃ তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন, পৃঃ ১৬১)</h4>সার্বিক আলোচনায় ঈমানের যে সাধারণ স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য উদ্ভাসিত হয় তা নিুরূপঃ ১. এক অদ্বিতীয় আল্লাহ এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল সাঃ-এর ওপর আন্তরিক বিশ্বাস 
২. আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ প্রতিপালনের জন্য নিয়োজিত ফেরেশতাকুলের প্রতি বিশ্বাস 
৩. পথ প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন যুগ ও বিভিন্ন জাতির কাছে আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তার প্রতি বিশ্বাস 
৪. পথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরিত নবী-রাসূলদের রিসালাতে বিশ্বাস
৫. পরকাল বা আখেরাতের ওপর বিশ্বাস
 ৬. তকদির বা ভালো-মন্দ আল্লাহর তরফ থেকে আসে, এ বিশ্বাস 
৭. শেষে বিচার দিবস অর্থাৎ মৃতুøর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস

Popular Posts

Contact Form

Name

Email *

Message *

Powered by Blogger.